সমকালীন প্রতিবেদন : পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে পারদ চড়তে শুরু করেছে রাজনীতির ময়দানে। সোমবার ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করে রাজ্য বিজেপির এক প্রতিনিধি দল। বঙ্গ বিজেপির সহ-সভাপতি তাপস রায় এবং শিশির বাজোরিয়া কমিশনের কাছে স্পষ্ট দাবি জানিয়েছেন যে, বাংলায় এবার দীর্ঘ সময় ধরে নয়, বরং খুব কম ব্যবধানে মাত্র এক বা দুটি দফায় ভোট করানো হোক। একদা ‘বেশি দফা মানেই স্বচ্ছ ভোট’– এই ধারণাকে ভ্রান্ত বলে মনে করছেন অমিত শাহ-শুভেন্দু অধিকারীরা। তাঁদের মতে, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার যুগে দফায় দফায় ভোট করানোর আর প্রয়োজনীয়তা নেই।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, এদিনের বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের রোষের মুখে পড়ে চারটি গুরুত্বপূর্ণ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি– আবগারি দপ্তর, নার্কোটিক্স, এয়ারপোর্ট অথরিটি এবং আরবিআই। নির্বাচনের আগে নেশাজাতীয় দ্রব্যের রমরমা রুখতে আবগারি দপ্তরকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি সীমান্তবর্তী এলাকায় মদ উৎপাদন বন্ধের কথা বলা হয়েছে।
বৈঠকে বিনীত গোয়েলকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন তোলা হয় যে, সারা দেশে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে কেন ‘নার্কোটিক্স অ্যাডভাইজারি কমিটি’ নেই? সূত্রের খবর, এর কারণ দর্শাতে গেলে কমিশনারের ‘ধমক’ খেয়ে থমকে যেতে হয় তাঁকে। অন্যদিকে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে ভোটের সময় জেলাগুলিতে কালো টাকার লেনদেন কোনোভাবেই না ঘটে।
দীর্ঘদিন কংগ্রেসের ঘরানায় রাজনীতি করা তাপস রায় এদিন কমিশনারের কাছে রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে সরব হন। তাঁর দাবি, বাংলায় ভোট অবাধ করতে হলে আগে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ করতে হবে। সমাজবিরোধী, তোলাবাজ এবং প্রশাসনের একাংশ ‘দলদাস’ পুলিশ কর্মীদের কব্জা থেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে মুক্ত না করলে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব নয় বলেই মত প্রকাশ করেছেন তিনি।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে বিজেপি যে দীর্ঘ ১৭ দফা দাবি পেশ করেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
অফিসারদের বদলি : গত তিনটি নির্বাচনে (২০১৯, ২০২১, ২০২৪) যেসব আধিকারিককে কমিশন অপসারিত করেছিল, তাঁদের এবার সম্পূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতে হবে।
আধুনিক নজরদারি: প্রতিটি বুথে বাধ্যতামূলক ওয়েবক্যাম বসাতে হবে। কোনো কারণে ক্যামেরা বিকল হলে তৎক্ষণাৎ ভোট বন্ধ করে দিতে হবে।
সংবেদনশীল বুথ: যে সব বুথে অতীতে হিংসা হয়েছে বা যেখানে ৮৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে, সেগুলিকে ‘সংবেদনশীল’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা: সিএপিএফ-কে অনেক আগে মোতায়েন করতে হবে এবং তারা যেন স্থানীয় পুলিশের ওপর নির্ভরশীল না হয়। এমনকি বাহিনীর জওয়ানরা যেন স্থানীয় কারো আতিথেয়তা বা ‘উপঢৌকন’ গ্রহণ না করেন, সেদিকেও কড়া নজর রাখতে হবে।
কর্মচারী নিয়োগ: ভোটকর্মী হিসেবে ৫০ শতাংশ রাজ্য এবং ৫০ শতাংশ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী রাখতে হবে। কোনো সিভিক ভলান্টিয়ার বা চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের রাখা চলবে না।
বিজেপির অন্যতম দাবি হলো, ভোটারদের পরিচয়পত্র যাচাইয়ের কাজ দুই ধাপে করতে হবে। প্রথমে বুথের বাইরে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে এবং পরে ভেতরে পোলিং অফিসার দিয়ে। এজেন্টদের বুথের ভেতরে নয়, বাইরে বসানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যাতে ছাপ্পা ভোট বা প্রভাব খাটানো রোখা যায়। এছাড়া, ভোট গণনা কেন্দ্রগুলি শুধুমাত্র জেলা বা মহকুমা স্তরে রাখার দাবি জানানো হয়েছে, যেখানে কেন্দ্রীয় আধিকারিকদের সমান অংশীদারিত্ব থাকবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের ঢের বাকি থাকলেও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ তৈরির এই কৌশল রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। কমিশন এই দাবিগুলি কতটা গুরুত্ব সহকারে বিচার করে, এখন সেটাই দেখার।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন