সমকালীন প্রতিবেদন : কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬–২৭ পেশ করে ব্যক্তিগত আয়করে কোনও নতুন ছাড় বা নতুন ট্যাক্স স্ল্যাবের ঘোষণা করলেন না কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তবে সরাসরি ছাড় না দিলেও আয়কর ব্যবস্থায় একাধিক বড় সংস্কারের ঘোষণা করে কর কাঠামোকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তি-বান্ধব করার রূপরেখা তুলে ধরলেন তিনি।
অর্থমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা, করদাতাদের সুবিধা দিতে প্রক্রিয়া সরল করা হবে, কিন্তু কর ফাঁকি বা অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনও রকম শিথিলতা দেখানো হবে না। সেই কারণেই আয় গোপন বা ভুল তথ্য দিলে জরিমানার অঙ্ক বাড়িয়ে বকেয়া করের ১০০ শতাংশ করা হচ্ছে। এমনকি স্থাবর নয় এমন সম্পদ, যেমন আর্থিক বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য গোপন করলেও এবার থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা, আগামী ১ এপ্রিল থেকেই কার্যকর হচ্ছে নতুন আয়কর আইন। নতুন আইনে রিটার্ন জমার সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ করদাতারা ৩১ জুলাই পর্যন্ত আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। অডিট হয়নি এমন ব্যবসায়িক মামলা বা ট্রাস্টের ক্ষেত্রে সময়সীমা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩১ অগস্ট। পাশাপাশি, আইটিআর সংশোধনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৩১ মার্চ পর্যন্ত করা হয়েছে, যেখানে অল্প ফি দিয়ে সংশোধনের সুযোগ মিলবে। তবে ITR-1 ও ITR-2 জমার শেষ তারিখ আগের মতোই ৩১ জুলাই বহাল থাকছে।
কর ফাঁকি সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিতেও বদল আনছে সরকার। ছোটখাটো কর ফাঁকির ক্ষেত্রে আর জেলযাত্রা হবে না বলে ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এমন ক্ষেত্রে বকেয়া করের উপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত জরিমানা দিলেই নিষ্কৃতি মিলবে। সরকারের মতে, এতে ছোট করদাতারা অযথা হয়রানির হাত থেকে রেহাই পাবেন। একই সঙ্গে বড় স্বস্তি দেওয়া হয়েছে দুর্ঘটনায় বিমা ক্লেম বা সরকারি ও বেসরকারি ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে। এতদিন এই ধরনের ক্ষতিপূরণের উপর ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হত। নতুন বাজেট অনুযায়ী, এবার থেকে এই ক্ষতিপূরণের উপর আর কোনও কর দিতে হবে না।
আইটি এবং গবেষণা ক্ষেত্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইটি, আইটি-এনেবলড সার্ভিসেস (ITeS), কেপিও এবং সফটওয়্যার-সংযুক্ত আরঅ্যান্ডডি পরিষেবাকে একটি অভিন্ন কর শ্রেণির আওতায় আনা হচ্ছে। এই সব ক্ষেত্রের জন্য ১৫ শতাংশ ‘কমন সেফ হারবার মার্জিন’ নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এতে কর সংক্রান্ত জটিলতা কমবে এবং ব্যবসার পরিবেশ আরও অনুকূল হবে।
বাজেটে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও বড় স্বস্তির খবর। ১৭টি জীবনদায়ী ওষুধের উপর আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর ফলে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস-সহ একাধিক গুরুতর রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের দাম কমবে বলে আশা। চাকরির উপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে গার্লস হস্টেল তৈরির পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে।
পরিকাঠামো উন্নয়নে বাংলার জন্যও এসেছে বড় ঘোষণা। ডানকুনিতে পণ্য পরিবহণের জন্য বিশেষ করিডর তৈরি হবে। পাশাপাশি, দুর্গাপুরে শিল্প করিডর গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। দেশজুড়ে সাতটি হাই-স্পিড রেল করিডর তৈরির কথাও জানানো হয়েছে—মুম্বই–পুনে, পুনে–হায়দরাবাদ, হায়দরাবাদ–বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ–চেন্নাই, চেন্নাই–বেঙ্গালুরু, দিল্লি–বারাণসী এবং বারাণসী–শিলিগুড়ি।
সস্তা হচ্ছে ১৭টি জীবনদায়ী ওষুধ, স্মার্টফোন ও মোবাইল যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি, চামড়ার ব্যাগ ও জুতো, সি ফুড, খেলার সামগ্রী, বিদেশ ভ্রমণ, সিএনজি, সোলার প্যানেল, মাইক্রোওয়েভ, বিমানের যন্ত্রাংশ, বিড়ি।
দামি হচ্ছে সিগারেট, মদ, অন্যান্য তামাকজাত পণ্য, নির্দিষ্ট কিছু খনিজ, সব মিলিয়ে, বাজেট ২০২৬–২৭-এ সরাসরি করছাড় না থাকলেও সংস্কার, সরলীকরণ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি কর ফাঁকি রুখতে কড়া বার্তা দিল কেন্দ্র।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন