সমকালীন প্রতিবেদন : ভারতের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব গণেশ চতুর্থী এবারও দেশ জুড়ে মহাসমারোহে পালিত হচ্ছে। ভক্তদের বিশ্বাস, গণপতি বাপ্পা বা গণেশজি হলেন বিঘ্নহর্তা ও মঙ্গলদাতা। তাই এই উৎসব শুধু আধ্যাত্মিক দিক থেকেই নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
গণেশ চতুর্থী মূলত ভগবান শিব-পার্বতীর পুত্র গণেশের জন্মোৎসব। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এই দিনে গণেশের পুজো করলে জীবনের নানা প্রতিবন্ধকতা দূর হয় এবং সৌভাগ্য লাভ হয়। ব্যবসায়ীরা নতুন কাজ শুরুর আগে কিংবা শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগে গণেশের আরাধনা করেন। মহারাষ্ট্র, গোয়া, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশে বিশেষ উৎসাহে পালিত হলেও বর্তমানে সারা দেশজুড়েই উৎসবটির জনপ্রিয়তা বিস্তৃত হয়েছে।
প্রাচীনকাল থেকেই গণেশ পুজোর প্রচলন ছিল। তবে গণেশ চতুর্থীকে জনসমক্ষে গণআন্দোলনের রূপ দেন মহারাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামী লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ শাসনের সময় তিনি গণপতি উৎসবকে ঘরোয়া পরিসর থেকে রাস্তায় এনে গণআন্দোলনে রূপান্তরিত করেন। উদ্দেশ্য ছিল, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য জনগণকে একত্রিত করা। সেই থেকেই গণেশ চতুর্থী শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতীক হিসেবেও গুরুত্ব পায়।
দশ দিনব্যাপী এই উৎসব সাধারণত ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী থেকে শুরু হয়। ঘরে ঘরে বা প্যান্ডেলে গণেশের প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভক্তরা প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় আরতি করেন, মন্ত্রোচ্চারণ ও ভজন পরিবেশন করেন। মিষ্টান্নের মধ্যে ‘মোদক’ বিশেষ প্রিয়, যা গণেশের অতি প্রিয় খাবার বলে ধরা হয়। শেষ দিন ‘অন্ত্যেষ্টি’ বা ‘বিসর্জন’-এর মাধ্যমে প্রতিমাকে নদী বা সমুদ্রে বিসর্জন দেওয়া হয়।
আজকের দিনে গণেশ চতুর্থী শুধু ধর্মীয় উৎসবের সীমায় আবদ্ধ নয়, বরং এটি স্থানীয় শিল্প, সংগীত, নৃত্য, নাটক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেরও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। বহু স্থানে পরিবেশবান্ধব প্রতিমা তৈরির প্রচলন শুরু হয়েছে, যাতে নদী ও সমুদ্রদূষণ কমানো যায়। এছাড়া রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা শিক্ষামূলক কর্মশালার মতো সামাজিক উদ্যোগও অনেক সংগঠন এই সময়ে আয়োজন করে।
গণেশ চতুর্থী একদিকে ভক্তদের আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস, অন্যদিকে সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও আধুনিক সামাজিক বার্তার সমন্বয়ে এই উৎসব ভারতের সার্বজনীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন