সমকালীন প্রতিবেদন : স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে বিপুল আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারের এই স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে লক্ষ লক্ষ উপভোক্তার বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি সূত্রের দাবি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে উপভোক্তাদের খোঁজ করতে গিয়ে বহু স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের ক্ষেত্রে অসঙ্গতি সামনে এসেছে। অভিযোগ, প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ বা তারও বেশি কার্ডের উপভোক্তাদের পরিচয় ও অস্তিত্ব যাচাই করা যাচ্ছে না। তবে এই সংখ্যার চূড়ান্ত সত্যতা এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
নবান্ন সূত্রে খবর, নতুন স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের কার্ড তৈরির প্রক্রিয়ায় পুরনো স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের তথ্য যাচাই করতে গিয়েই এই গরমিল নজরে আসে। অভিযোগ, অস্তিত্বহীন উপভোক্তাদের নামেও কার্ড থাকায় রাজ্য সরকারকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রিমিয়াম বাবদ দিতে হয়েছে। এই অনিয়মের পিছনে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখতে ফরেনসিক অডিটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, কার্ড তৈরি থেকে শুরু করে চিকিৎসার বিল, চিকিৎসকের স্বাক্ষর, হাসপাতাল এবং বিমা সংস্থার বিভিন্ন স্তরে অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর কথায়, প্রাথমিক তদন্তেই দুর্নীতির যে ছবি সামনে এসেছে, তা বৃহত্তর অনিয়মের ইঙ্গিত দিতে পারে।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প নিয়ে ক্যাগের রিপোর্টেও একাধিক গুরুতর অসঙ্গতির উল্লেখ রয়েছে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবর্ষের প্রকল্প পর্যালোচনা করে নিরীক্ষক সংস্থা জানিয়েছে, পরিকল্পনা, উপভোক্তা যাচাই, হাসপাতালের গ্রেড নির্ধারণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত স্বাস্থ্যসাথীতে নথিভুক্ত পরিবারের সংখ্যা রাজ্যের রেশন কার্ডধারী পরিবারের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি ছিল। ফলে উপভোক্তাদের যোগ্যতা যাচাই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বেসরকারি হাসপাতালের গ্রেডিংয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ক্যাগের ৫০টি হাসপাতালের নথি পরীক্ষায় ৩১টি হাসপাতালকে তাদের পরিকাঠামো ও পরিষেবার তুলনায় উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এর ফলে অতিরিক্ত ১৪.৪৮ কোটি টাকা মেটানো হয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হাজার হাজার চিকিৎসার দাবি মেটানো হয়নি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাতেও দুর্বলতা ছিল বলে জানিয়েছে নিরীক্ষক সংস্থা।
২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের সূচনা হয়। এই প্রকল্পে যোগ্য পরিবারগুলিকে বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নগদহীন চিকিৎসার সুবিধা দেওয়ার কথা। রাজ্য সরকারই এর প্রিমিয়াম বহন করে। ফলে উপভোক্তাদের অস্তিত্ব যাচাইয়ে গাফিলতি প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থের অপচয় নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হবে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত উপভোক্তার সংখ্যা, অনিয়মের ধরন এবং সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কতটা স্পষ্ট হয়, সেটাই দেখার।






কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন