সমকালীন প্রতিবেদন : রাজ্যে পরিবর্তনের সূচনালগ্নে শিক্ষা ব্যবস্থাকে রাজনীতির অলিন্দ থেকে মুক্ত করে স্বচ্ছতা ফেরাতে ‘ক্লিন আপ ড্রাইভ’-এর বড়সড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উচ্চশিক্ষা দফতরের এক বিজ্ঞপ্তি সামনে আসতেই রাজ্য রাজনীতি ও শিক্ষামহলে তীব্র শোরগোল তৈরি হয়েছে। সরকারের সেই নীতি ও বার্তার সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপের চরম অমিল তুলে ধরে সমালোচকেরা দাবি করছেন, প্রাক্তন শাসকদলের বিরুদ্ধে থাকা রাজনৈতিক দাপট ও অনিয়মের যে অভিযোগ দূর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, প্রকাশিত নতুন তালিকায় ফের সেই শাসনক্ষমতায় থাকা দলের সাংসদ, বিধায়ক ও পরিচিত মুখদেরই অগ্রাধিকার দেখা যাচ্ছে।
প্রশাসনিক পরিকাঠামো পরিবর্তনের লক্ষ্যে গত মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই রাজ্যের সমস্ত সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজের পরিচালন সমিতি বা গভর্নিং বডি একযোগে ভেঙে দিয়েছিল উচ্চশিক্ষা দফতর। পরবর্তীতে নবান্ন সভাঘরে ৪১টি দফতরের শীর্ষ কর্তাদের নিয়ে আয়োজিত বৈঠকেও শিক্ষাঙ্গনে প্রশাসনিক সংস্কারের স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে।
তবে আজ রাজ্যের ২৪৭টি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির নাম ঘোষণার পর দেখা যাচ্ছে, প্রত্যাশিত রদবদলের বদলে এই তালিকা মূলত শাসকদলের সাংসদ ও বিধায়কদের একপ্রকার পুনর্বাসন তালিকায় পরিণত হয়েছে। এমনকি যে সমস্ত অঞ্চলে বিরোধীরা জয়ী হয়েছে, সেখানকার কলেজগুলির পরিচালনার দায়িত্বও শাসকদলের শীর্ষ নেতাদের হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছে।
বিগত বছরগুলিতে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি এবং পর্ষদ ও কমিশনের ডামাডোলে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা দূর করতে একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ার অঙ্গীকার করা হয়। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই তালিকায় অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের বদলে যেভাবে দলীয় জনপ্রতিনিধিদের সভাপতি পদে বসানো হলো, তাতে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন ও সার্বিক স্বচ্ছতার আশ্বাস শেষ পর্যন্ত কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল।
উচ্চশিক্ষা দফতরের নতুন নির্দেশিকা অনুসারে, গুরুত্বপূর্ণ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে বসানো হয়েছে শীর্ষ জনপ্রতিনিধিদের। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সাংসদদের মধ্যে বালুরঘাট ও গঙ্গারামপুর কলেজের দায়িত্ব পেয়েছেন ডঃ সুকান্ত মজুমদার, গোবরডাঙা হিন্দু ও হাবড়ার শ্রীচৈতন্য কলেজের সভাপতি করা হয়েছে শান্তনু ঠাকুরকে, এবং ওন্দা থানা মহাবিদ্যালয় ও রামানন্দ কলেজের ভার গিয়েছে সৌমিত্র খাঁয়ের কাঁধে।
এছাড়া কাঁথির প্রভাত কুমার কলেজে সৌমেন্দু অধিকারী, মহিষাদল রাজ কলেজে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, চাঁচল ও হরিশ্চন্দ্রপুর কলেজে খগেন মুর্মু, চাকদহ ও কল্যাণী মহাবিদ্যালয়ে জগন্নাথ সরকার এবং উত্তরবঙ্গের বিজনবাড়ি, সাউথ ফিল্ড ও শিলিগুড়ি কলেজ অফ কমার্সে রাজু বিস্তার মতো সাংসদদের সভাপতি করা হয়েছে। একইভাবে আলিপুরদুয়ারের শামুকতলা সিধু কানু ও বিবেকানন্দ কলেজের দায়িত্ব পেয়েছেন মনোজ টিগ্গা।
রাজধানী কলকাতা ও শহরতলির নামী কলেজগুলিতেও হেভিওয়েট নেতাদের উপস্থিতি নজরকাড়া। বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বোসকে কোচবিহার ও ঠাকুর পঞ্চানন মহিলা মহাবিদ্যালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের অধীনে এসেছে আশুতোষ, যোগমায়া দেবী ও শ্যামাপ্রসাদ কলেজ। বিদ্যাসাগর কলেজের বিভিন্ন শাখার দায়িত্ব সামলাবেন মন্ত্রী তাপস রায়। বঙ্গবাসী কলেজের তিনটি বিভাগের দায়িত্ব পাচ্ছেন বিধায়ক সজল ঘোষ, অন্যদিকে সুরেন্দ্রনাথ ল ও ব্যারাকপুর রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ কলেজের সভাপতি হচ্ছেন কৌস্তভ বাগচী। এছাড়া গুরুদাস ও সরোজিনী নাইডু কলেজে তরুনজ্যোতি তিওয়ারি এবং মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্র, শ্রীশ চন্দ্র ও মহারাণী কাশীশ্বরী কলেজের দায়িত্বে রয়েছেন রিতেশ তিওয়ারি।
জেলা স্তরেও একই চিত্রের প্রতিফলন ঘটেছে। মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের হাতে দেওয়া হয়েছে বোলপুর, শম্ভুনাথ ও সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজের ব্যাটন। মন্ত্রী দীপক বর্মণ ফালাকাটা ও লীলাবতি মহাবিদ্যালয়, মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল আসানসোলের বানওয়ারিলাল ভালোটিয়া কলেজ এবং মন্ত্রী ডঃ শংকর ঘোষ শিলিগুড়ি ও সূর্য সেন মহাবিদ্যালয়ের দ্বায়িত্বে রয়েছেন। খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনীয়া দায়িত্ব পেয়েছেন বনগাঁ দীনবন্ধু মহা বিদ্যালয় এবং নহাটা যোগেন্দ্রনাথ মহা বিদ্যালয়ের। জেলার অন্য বিধায়কদের মধ্যে রুদ্রনীল ঘোষ, ডঃ হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায়, মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ, রূপা গাঙ্গুলী, জিতেন্দ্র তিওয়ারি এবং অশোক দিন্দাকে বিভিন্ন কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি করা হয়েছে।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন