সমকালীন প্রতিবেদন : নেপাল ও তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে আচমকা হড়পা বানে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। বুধবার সকালে তীব্র জলস্রোত ও কাদার ধস পাহাড়ের ওপর থেকে হঠাৎ নেমে এলে মুহূর্তের মধ্যে একের পর এক এলাকা প্লাবিত হয় এবং মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বহু গ্রাম। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, বিপর্যয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৫৩ জন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৮০০-রও বেশি মানুষ। নেপালের ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উদ্ধারকাজে চরম বেগ পেতে হচ্ছে।
এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নেপালের অধিবাসীদের পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ভারতীয় পুণ্যার্থী ও পর্যটকরাও। ভারতের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা ও ভ্রমণসূত্রে নেপালে গিয়ে আটকে পড়া বা নিখোঁজ হওয়া ভারতীয়ের সংখ্যা অন্তত ২৮৮। পাশাপাশি কৈলাস যাত্রার পথে নেপাল হয়ে চিনে প্রবেশ করা আরও প্রায় ২০০ জন ভারতীয় তীর্থযাত্রী তিব্বত সীমান্তে আটকে রয়েছেন। এ ছাড়া নেপালের ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করা ৭৩ জন ভারতীয় শ্রমিকেরও সন্ধান মেলেনি।
পশ্চিমবঙ্গ থেকেও একটি ভ্রমণসংস্থার মাধ্যমে মানস সরোবর দর্শনে যাওয়া ৩২ জনের একটি দলের সঙ্গে রাজ্য প্রশাসন সমস্ত যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি সবরকম সহায়তার আশ্বাস দেন। ভারতের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই কন্ট্রোল রুম ও হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে এবং বিশেষ বিমানে কাঠমান্ডুতে ৪৮.৫ টন ত্রাণ সামগ্রী ও উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে।
হঠাৎ এই প্রলয়ঙ্করী বানের নেপথ্যে একাধিক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণকে চিহ্নিত করেছেন ভূবিজ্ঞানীরা। ভূবিজ্ঞানী ডঃ সুজীব করের মতে, অতিবৃষ্টির পাশাপাশি বিশ্ব উষ্ণায়ন ও আকস্মিক তাপমাত্রার তারতম্যই এই বিপর্যয়ের প্রধান অনুঘটক। ঘটনার ঠিক আগে ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা এক ধাক্কায় প্রায় ১২-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ায় হিমালয়ের উঁচুতে থাকা বিশাল বরফের চাঁইয়ে ফাটল ধরে এবং ভূমিকম্পের মতো কম্পনে তা খসে পড়ে পাহাড়ের প্রাকৃতিক হ্রদগুলোতে।
এর ফলে হ্রদের জল উপচে নদীখাত বেয়ে বাঁধ ভেঙে কোটি কোটি টন জল ও কাদা হুহু করে নীচের দিকে নেমে এসে হড়পা বানের রূপ নেয়। একইসঙ্গে তিনি পর্বতাঞ্চলে অপরিকল্পিত জনবসতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়েও সতর্ক করেন। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিপুল নির্মাণকাজ ও নদী অববাহিকায় অতিরিক্ত বহুতল নির্মাণের ফলে পাহাড়ের শিলা প্রকৃতির বাঁধন আলগা হয়ে গিয়েছিল, যার দরুন এই প্লাবনের প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করে।
পরিবেশবিজ্ঞানীরা একবাক্যে মনে করছেন, প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে অবিলম্বে স্থায়ী উন্নয়ন নীতি গ্রহণ না করলে এ ধরনের পাহাড়ি বিপর্যয় ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে ভারতীয় দূতাবাসের সহায়তায় আটকে পড়া পুণ্যার্থীদের দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফেরানোর জোড়াতাল চেষ্টা চালাচ্ছে বিদেশমন্ত্রক।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন