সমকালীন প্রতিবেদন : বাংলায় ফের নিপা ভাইরাসের হদিশ মিলতেই রাজ্যজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে ফিরে এসেছে করোনাকালের স্মৃতি– সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং, লকডাউন, সংক্রমণের ভয়। এই পরিস্থিতিতে অনেকেরই প্রশ্ন, নিপা কি আবার তেমনই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দেবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি। কারণ করোনা ও নিপা ভাইরাসের মধ্যে একাধিক মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
শীতের মরশুমে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালের দুই নার্সের শরীরে নিপা ভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে। তাঁরা বর্তমানে আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন। পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুরে আরও একজন আক্রান্ত হওয়ার খবর মিলেছে। সংক্রমণের আশঙ্কায় আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
নিপা আতঙ্কের আবহে কেন্দ্রও পাশে দাঁড়িয়েছে রাজ্যের। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে জানান, পশ্চিমবঙ্গে নিপা সংক্রমণের খবর মিলেছে এবং এর মোকাবিলায় কেন্দ্র সবরকম সাহায্য করবে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। নাড্ডার কথায়, কল্যাণী এইমসে নিপা সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। পাশাপাশি নজরদারি, ল্যাবরেটরি ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বিশেষজ্ঞ দলকে সতর্ক রাখা হয়েছে।
রাজ্য প্রশাসনও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। কলকাতার বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালে নিপা চিকিৎসার জন্য বিশেষ ওয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে। সেখানে সাধারণ ও বিশেষ শয্যা রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা ও নিপা– দু’টি ভাইরাসই শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ঘটাতে পারে, তবে এদের প্রকৃতি ও ঝুঁকি একেবারেই আলাদা। নিপা একটি নিশ্চিত জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ এটি প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ায় প্রথম শনাক্ত হওয়া এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক ফলখেকো বাদুড়। শুয়োর, কুকুর, বিড়াল, ঘোড়া-সহ একাধিক প্রাণীর মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।
অন্যদিকে, কোভিড-১৯ বা সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের উৎস নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। চিনের উহানে প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়লেও, তা ঠিক কীভাবে মানুষের মধ্যে ছড়াল– এই প্রশ্নে বিতর্ক থেকেই গেছে।
চিকিৎসার দিক থেকেও দু’টি ভাইরাসের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। নিপা ভাইরাসের এখনও কোনও অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক। মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি নিয়ে গবেষণা চলছে এবং ভবিষ্যতে তা ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোভিডের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ‘কিউর’ না থাকলেও, ইতিমধ্যে একাধিক টিকা বাজারে এসেছে এবং সেগুলি বিশ্বজুড়ে প্রয়োগও করা হয়েছে।
সংক্রমণ ক্ষমতার দিক থেকে নিপা তুলনামূলকভাবে কম ছড়ায়। এর আর-নট একের নীচে থাকায় ব্যাপক সংক্রমণের সম্ভাবনা কম, কিন্তু মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি– প্রায় ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। কোভিডের ক্ষেত্রে সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি হলেও মৃত্যুহার তুলনায় কম, গড়ে ১ শতাংশের নীচে।
উপসর্গের ক্ষেত্রেও পার্থক্য স্পষ্ট। কোভিডে সাধারণত জ্বর, কাশি, শরীর ব্যথা বা গন্ধ না পাওয়ার মতো মৃদু উপসর্গ দেখা যায়। নিপার ক্ষেত্রে শুরুতে জ্বর ও মাথাব্যথা হলেও পরে স্নায়বিক জটিলতা, এনসেফালাইটিস, খিঁচুনি এমনকি কোমা পর্যন্ত হতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, দু’টি ভাইরাসের ক্ষেত্রেই আরটি-পিসিআর পরীক্ষাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। সংক্রমণ ঠেকাতে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, আইসোলেশন এবং দ্রুত চিকিৎসাই মূল হাতিয়ার। আতঙ্ক নয়, সচেতনতা ও সঠিক পদক্ষেপই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন