Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

বৃহস্পতিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

এই জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজোয় মহিলারাই পর্দার আড়ালে

 ‌‌

Durga-Puja-in-the-landlord-house

সমকালীন প্রতিবেদন : ঘটা করে মায়ের পুজোয় কেন মেয়েরাই পর্দার আড়ালে? কোথায় চলে এমন নিয়ম? কেন এমন অদ্ভুত নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ এই বাড়ির মহিলারা? দুর্গাপুজোর কটাদিন এভাবেই কাটে। ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা নিয়ম আজও ভেঙে ফেলার স্পর্ধা দেখাতে পারেনি ওই মহিলারা। কেন? এই পর্দার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কোন রহস্য? বাড়ির মহিলারা পর্দা প্রথা ভাঙলে ঘটে যেতে পারে কি বড় কোনও বিপদ? 

পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের চকদিঘির সিংহরায় জমিদার বাড়ির পুজো। যে বাড়ি এবং তার পুজোর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ছিল স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের। একদা পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় দুর্গা পুজোয় এই বাগানবাটিতে এসে থাকতেন। এমনকি এই বাগানবাটিতেই বিদ্যাসাগর মহাশয়ের থাকার জন্য একটি জলাশয়ের ধারে তৈরি হয়েছিল পাকা ঘর। সেই বাড়িতেই কি না মায়ের পুজোয় বাড়ির মা-বোনেরাই ব্রাত্য। জমিদার বাড়ির পুজোর জোগাড়ে মহিলাদের অংশগ্রহন নিষিদ্ধ। 

এখনও অন্দর মহল থেকে পরিবারের মহিলারা মন্দিরে পুজো দিতে কিংবা ঠাকুর দেখতে আসার সময় তাদের পথের দু’পাশ আড়াল করার জন্য কাপড় দিয়ে 'কানাত' অর্থাৎ 'পর্দা' টাঙানো হয়। ‌বাড়ির বউ ও মহিলারা ওই পর্দার পেছনে থাকেন। বংশ পরম্পরয়ায় এই ঐতিহ্য মেনে আসা হচ্ছে। কিন্তু কেনও এমন নিয়ম? জানার জন্য বেশ খানিকটা পিছিয়ে যেতে হবে। জানতে হবে এই পরিবারের ইতিহাস। 

কথিত আছে, চকদিঘির জমিদারদের পূর্ব পুরুষেরা ছিলেন রাজপুত ক্ষত্রিয়। বুন্দেলখণ্ডের শাসকদের বংশধররা চকদিঘিতে জমিদারি চালাতেন। দুর্গাচরণ রায়-এর লেখা “দেবগণের মর্ত্যে  আগমন” গ্রন্থে চকদিঘির জমিদারদের কথা উল্লেখ রয়েছে। তা থেকে জানা যায়, রাজস্থান থেকে চকদিঘিতে সর্বপ্রথম এসে ছাঁউনি ফেলেছিলেন নল সিং। সেখানেই তিনি বসবাস শুরু করে। পরবর্তীকালে জমিদারি সত্ব লাভের পর নল সিং অগাধ ঐশ্বর্য্য ও খ্যাতি লাভ করেছিলেন। 

তবে এই জমিদার বংশের খ্যাতি শীর্ষে পৌঁছায় সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের হাত ধরে। তিনি খুবই প্রজাবৎসল ছিলেন। শিক্ষার উন্নতিতে চকদিঘিতে তৈরি করেছিলেন স্কুল। সেই স্কুলের উদ্বোধন করেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়। এছাড়াও চকদিঘি হাসপাতাল এবং আজকের 'মেমারি- চকদিঘি'‌ সড়কপথ সবই তৈরি হয়েছিল সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। 

জমিদারদের বাগান বাটির জন্য চকদিঘির নামডাক। বাগানবাটির ভিতর কাছাড়ি বাড়ির সামনেই রয়েছে দুর্গা পুজোর স্থায়ী মন্দির। মন্দিরের সঙ্গেই রয়েছে টিনের ছাউনি দেওয়া বিশাল আকার বসার জায়গা। এই জমিদার পরিবারের অপর দুর্গা মন্দিরটি রয়েছে চকদিঘি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে মণিরামবাটি গ্রামে। সেখানকার  মন্দিরটিও একই আদলে তৈরি। সেখানেও জমিদারি ঐতিহ্য মেনে দুর্গা পুজোর যাবতীয় আয়োজন করা হয়। পঞ্জিকার সময় মেনে একই সময়ে দুই বাড়ির মন্দিরে পুজো হয়। সারাবছর অন্যান্য জায়গায় থাকলেও পুজোর কটাদিন পরিবারের সদস্যরা জমিদার বাড়িতেই একসঙ্গে আনন্দ উপভোগ করেন। 

বৈদিক মতে সিংহরায় জমিদার বাড়ির দুর্গা পুজোর আরাধনা চলে। একচালার কাঠামোয় ডাকের সাজে প্রতিমা সাজানো হয়। দেবী মূর্তির দু’পাশে বসানো হয় জয়া ও বিজয়া নামে দুই পরির মূর্তি। মন্দির চত্ত্বর সাজানো হয় অন্যভাবে। একটি গোটা নারকেল, আম্র পল্লব ও একটি কাঁঠালি কলা একসাথে নিয়ে বাঁধা থাকে মন্দির চত্ত্বরের প্রতিটি থামে। প্রতিপদের দিন থেকে শুরু হয় পুজো। পুজোয় অন্যান্য ফল যাই থাকুক না কেন কাজু, কিসমিস, পেস্তা ,আখরোট ও মেওয়া ফল দেওয়া চাই। 

নৈবেদ্য সাজানো হয় চিনির সন্দেশ, ডোনা, নবাত, রশকরা, মুড়কি দিয়ে। পারিবারিক নিয়ম মেনে স্থলপদ্মে হয় দেবীর পুজো। একমাত্র সন্ধিপুজোয় লাগে ১০৮ টি জল পদ্ম। সন্ধি পুজোর সময় দুটি মন্দিরের দেবী প্রতিমার সামনে ব্রাহ্মন পরিবারের বিধবা মহিলাকে দিয়ে ধুনো পোড়ান হয়। ব্যস এইটুকুই। বাড়ির মহিলারা পুজোর আর কোনও কাজেই অংশ নিতে পারেন না। পুজোর সমস্ত কাজ করেন বাড়ির পুরুষেরা। বংশ পরম্পরায় এমনটাই হয়ে আসছে। শুধুমাত্র আভিজাত্য বজায় রাখতেই নাকি আজও পুজোর সময় পর্দার আড়ালেই থাকেন জমিদার সিংহরায় বাড়ির মহিলা সদস্যরা। 

যুগ বদলেছে। বদলায়নি পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের চকদিঘির সিংহরায় জমিদার বাড়ির মহিলাদের জন্য তৈরি পর্দা প্রথা। বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মেলাননি এরা। এখনও বজায় রেখে চলেছেন বাড়ির ঐতিহ্য। মায়ের পুজোয় আজও তারা শুধু পালন করেন দর্শকের ভূমিকা, তাও আবার লোকচক্ষুর অন্তরালে।‌‌

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন