সমকালীন প্রতিবেদন : সব শুরুরই একটি অন্ত থাকে– ক্রিকেটের বাধ্যগত, শান্ত ও নিখাদ ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত অজিঙ্কা রাহানেও জীবনের সেই চরম সত্যকেই মেনে নিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে শুরু করে আইপিএল ও ঘরোয়া ক্রিকেট, অর্থাৎ সমস্ত ধরনের ক্রিকেটীয় ফরম্যাট থেকেই চিরতরে বুট জোড়া তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন ভারতীয় টেস্ট দলের এই অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে একটি অত্যন্ত আবেগঘন ভিডিও বার্তা পোস্ট করে নিজের অবসরের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন ভারতের এই অভিজ্ঞ ব্যাটার ও কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) অধিনায়ক।
ভিডিওতে চোখে জল নিয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ অবস্থায় রাহানেকে বলতে শোনা যায়, “জীবনের মূল সত্য হলো, যার শুরু আছে তার শেষও থাকবে। সময় এলে তাকে সম্মান জানিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। ব্যাটিংয়ের সময় আমি সবসময় টাইমিংয়ের ওপর জোর দিতাম, তাই সময়ের গুরুত্ব আমি জানি। আমার মনে হয়েছে, এগিয়ে যাওয়ার এটাই সেরা সময়।”
কান্না ভেজা কণ্ঠে তিনি আরও যোগ করেন, “আমার নাম ‘অজিঙ্ক’, যার অর্থ অপরাজিত। কিন্তু ক্রিকেট আমাকে শিখিয়েছে জীবনের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতা বেশি আসে। দল হেরেছে, ভুল করেছি, তা থেকে শিখেছি। কিন্তু একটা জায়গায় আমি কোনও দিন হারিনি—সেটা হলো আপনাদের হৃদয়ে জায়গা পাওয়া। আপনারা আমাকে আপন করে নিয়েছেন।” ভিডিওর ক্যাপশনে ‘ক্যাপ নম্বর ২৭৮’-কে বিদায় জানিয়ে সমস্ত সমর্থক ও অনুরাগীদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় দলের নির্বাচকদের রাডারের বাইরে ছিলেন এই ডানহাতি ব্যাটার। ভারতের হয়ে তিনি শেষ টেস্ট খেলেছেন ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের পর থেকে একদিনের আন্তর্জাতিক এবং ২০১৬ সালের পর টি-টোয়েন্টি দলেও তিনি আর সুযোগ পাননি। তবে ভারতের হয়ে তাঁর পরিসংখ্যান অত্যন্ত উজ্জ্বল।
৮৫টি টেস্ট ম্যাচে ৩৮.৪৬ গড়ে ৫,০৭৭ রান রয়েছে তাঁর ঝুলিতে, যার মধ্যে রয়েছে ১২টি শতরান ও ২৬টি অর্ধশতরান। টেস্টে তাঁর সর্বোচ্চ সংগ্রহ ১৮৮ রান। এ ছাড়া ৯০টি একদিনের ম্যাচে ৩টি শতরানসহ ২,৯৬২ রান ও ২০টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিকে ৩৭৫ রান করে তিনি বছরের পর বছর ভারতীয় মিডল অর্ডারের মূল ভরসা হয়ে উঠেছিলেন।
খেলোয়াড় রাহানের পাশাপাশি অধিনায়ক রাহানের অবদানও ভারতীয় ক্রিকেটে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ভারতের হয়ে মোট ৬টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে ৪টিতেই জয় এনে দিয়েছেন তিনি, বাকি ২টি ম্যাচ ড্র হয়। অর্থাৎ অধিনায়ক হিসেবে তিনি কোনও ম্যাচ হারেননি। বিশেষ করে নিয়মিত অধিনায়কের অনুপস্থিতিতে তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তরুণদের নিয়ে ভারতের ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়।
আইপিএলেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। শেষ দুই মরসুমে কেকেআর-এর অধিনায়কত্ব করলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। তবে অবসরের বার্তায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, মুম্বই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের পাশাপাশি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিদের ধন্যবাদ জানানোয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, খেলোয়াড় হিসেবে ক্রোড়পতি লিগেও আর নামবেন না তিনি। ডম্বিভলির সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে থেকে ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্নপূরণের যাত্রায় রাহানে সততা ও নিষ্ঠাকেই প্রধান অস্ত্র করেছিলেন।
তবে খেলোয়াড় জীবনের ইতি টানলেও ক্রিকেট থেকে তিনি একদম দূরে সরছেন না। ভারতীয় ক্রিকেটের বিবর্তনকে খুব কাছ থেকে দেখা রাহানে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তরুণ প্রজন্মকে ক্রিকেটের সঠিক মূল্যবোধ ও পাঠ দিতে ভবিষ্যতে হয়তো তাঁকে কোচ বা মেন্টরের ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। এক শান্ত অথচ দৃঢ় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে চিরকাল ‘অপরাজিত’ হয়েই থেকে গেলেন অজিঙ্ক রাহানে।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন