সমকালীন প্রতিবেদন : ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক ভরাডুবির পর দীর্ঘ দুই মাস ধরে যে অনড় অবস্থান নিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জী, অবশেষে তা থেকে সরে দাঁড়ালেন তিনি। নির্বাচনের ফলাফলকে 'কারচুপি' আখ্যা দিয়ে এবং পরাজয় স্বীকার না করে রাজভবনে গিয়ে ইস্তফা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তবে এই দীর্ঘ জেদের মাশুল দিতে হয়েছে তাঁর দলকেই।
গত দুই মাসে আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের এই চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে অবশেষে বাস্তবের মাটি কামড়ে পরাজয় স্বীকার করে নিলেন তিনি। শনিবার এক ফেসবুক লাইভে এসে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে শুভেচ্ছা জানান তৃণমূলনেত্রী।
ছাব্বিশের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ফলপ্রকাশের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাংবাদিক বৈঠক করে মমতা ব্যানার্জী দাবি করেছিলেন, তিনি হারেননি এবং এই ফলাফল তিনি মানেন না। স্বাভাবিকভাবেই তিনি শুভেন্দু অধিকারীকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাননি। কিন্তু তাঁর এই অবস্থান দলের অন্দরেই মারাত্মক ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে আসে।
দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশ উপেক্ষা করে বহু তৃণমূল বিধায়ক ও সাংসদ রাজ্য সরকারের আমন্ত্রণে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে যোগ দিতে শুরু করেন। অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও একের পর এক দলত্যাগের কারণে তৃণমূলের অস্তিত্বই এখন বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের এই চরম ভাঙন ঠেকাতেই দেরিতে হলেও সত্যিটা মেনে নিতে বাধ্য হলেন মমতা।
শনিবার ফেসবুক লাইভে এসে নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নাম সরাসরি উচ্চারণ না করলেও, তাঁর রাজনৈতিক অতীতের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শুভেচ্ছা জানান মমতা ব্যানার্জী। তিনি বলেন, "আমাদের যিনি মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে আমার শুভেচ্ছা৷ এটা আমি নিশ্চয়ই বলব না যে আপনি আজকে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মানে আপনি তৃণমূলটা করেননি৷ একদিন আপনিও কংগ্রেস করতেন, আপনার হয়ে আমিও বারবার আপনার কেন্দ্রে যেতাম৷ আপনিও ১০-১১ বছর তৃণমূল সরকারের একাধিক দপ্তরের মন্ত্রী ও ৬টি জেলার দায়িত্বে ছিলেন। হলদিয়া ও দিঘা উন্নয়ন পর্ষদ আপনাদের হাতেই ছিল।"
শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সিবিআই-ইডি তদন্ত নিয়েও সুর চড়ান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূল ছেড়ে নতুন শাসকদলের সাথে হাত মেলানো নেতাদের উদ্দেশ্যে তিনি কটাক্ষ করে বলেন, যাঁরা চলে গিয়েছেন তাঁরা যেন রাতারাতি সাধু হয়ে গিয়েছেন। আর যাঁরা এখনও তৃণমূলে আছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নতুন সরকারকে সতর্ক করে তিনি মনে করিয়ে দেন, "সব ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। মনে রাখবেন, আপনারা যত অত্যাচার করবেন, আমরা তত বাড়ব।"
ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এসে, দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বাম সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে টানা ১৫ বছর বাংলার মসনদে ছিলেন মমতা ব্যানার্জী। ফলে বাংলার মানুষ তাঁর থেকে মুখ ফেরাতে পারেন, তা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত কল্পনাও করতে পারেনি তৃণমূল শিবির। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, পরাজয় স্বীকার না করার যে জেদ তৃণমূলনেত্রী দেখিয়েছিলেন, তা আখেরে দলের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ণ করেছে। তৃণমূলের মমতাপন্থী শিবিরের একাংশও এখন মনে করছে, প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে শুরুতেই এই অবস্থান দেখানো উচিত ছিল। দেরিতে হলেও বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে পরাজয় মেনে নেওয়ার এই সিদ্ধান্তই হয়তো তৃণমূলকে আগামী দিনে ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ জোগাবে।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন