সমকালীন প্রতিবেদন : এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর অবশেষে কাটতে চলেছে গোবরডাঙা গ্রামীণ হাসপাতালের অচলাবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে তালাবন্ধ থাকা এই চিকিৎসাকেন্দ্রটি পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে জোরদার প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন গাইঘাটার বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর। তারই ধারাবাহিকতায় শনিবার হাসপাতালের বর্তমান পরিকাঠামো সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য দফতরের চার পদস্থ আধিকারিককে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতাল চত্বর পরিদর্শন করেন বিধায়ক। তাঁর এই ইতিবাচক পদক্ষেপে নতুন করে আশার আলো দেখছেন গোবরডাঙা ও সংলগ্ন এলাকার লক্ষাধিক বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৭ সালে বিশাল জমির ওপর গড়ে উঠেছিল গোবরডাঙা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে গোবরডাঙা শহর ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলির সাধারণ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল ছিল এটি। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য দফতর এখানে নতুন ভবন নির্মাণ করে এটিকে গ্রামীণ হাসপাতালের মর্যাদা দেয়। এরপর ২০০১ সালে হাসপাতালটির পরিচালনার গুরুভার গ্রহণ করে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদ।
প্রথম কয়েক বছর হাসপাতালের পরিষেবা মসৃণভাবে চললেও, ২০১৪ সালে এক অজ্ঞাত কারণে হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় এর অন্তর্বিভাগ। ফলে রোগী ভর্তি নেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে একজন চিকিৎসক ও দুজন স্বাস্থ্যকর্মীকে দিয়ে কোনওরকমে বহির্বিভাগ চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন আগে সেই একমাত্র চিকিৎসকও অবসর গ্রহণ করায় হাসপাতালের সম্পূর্ণ পরিষেবাই কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ে, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। সামান্য চিকিৎসার প্রয়োজনেও তাঁদের এখন মাইলের পর মাইল পেরিয়ে হাবড়া অথবা ঠাকুরনগর হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। সরকারি উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে এলাকায় একাধিক বেসরকারি নার্সিংহোম ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠলেও, সেখানে চিকিৎসার বিপুল খরচ বহন করা দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালটি পুনরায় চালুর দাবিতে গত কয়েক বছরে স্থানীয় বাসিন্দারা দফায় দফায় আন্দোলন করেছেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দরজায় কড়া নেড়েছেন। কিন্তু বারবার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
অবশেষে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর এই জনমুখী প্রকল্পটি নিয়ে কোমর বেঁধে নেমেছেন স্থানীয় বিধায়ক। হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর বলেন, "গোবরডাঙা ও আশপাশের গ্রামীণ এলাকার একটা বিশাল অংশের মানুষ এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। মানুষের এই চরম দুর্ভোগ আমরা চলতে দিতে পারি না। এই হাসপাতালটি রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ অধিগ্রহণ করবে এবং সমস্ত আধুনিক পরিকাঠামোসহ নতুন করে চিকিৎসা পরিষেবা চালু করা হবে।"
এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। স্থানীয় এক শীর্ষ বিজেপি নেতা বিদায়ী তৃণমূল সরকারকে নিশানা করে বলেন, "তৃণমূলের আমলে এলাকার মানুষের এই দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছিল। বিজেপি সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে দায়বদ্ধ, এবং দ্রুত এই হাসপাতাল চালু করে সাধারণ মানুষকে পরিষেবা দেওয়া হবে।"
শনিবারের এই হাইপ্রোফাইল পরিদর্শনের পর বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা ভুতুড়ে হাসপাতালটি ফের প্রাণ ফিরে পাবে এবং ঘরের কাছেই মানুষ উন্নত চিকিৎসা পাবেন– এই আশায় বুক বাঁধছেন গোবরডাঙার আপামর জনতা।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন