সমকালীন প্রতিবেদন : ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণের আগে বঙ্গ রাজনীতিতে পারদ চড়ালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রবিবার উত্তর ২৪ পরগনার মতুয়াগড় ঠাকুরনগর থেকে প্রচারে বিঁধলেন শাসকদল তৃণমূলকে। তবে রবিবাসরীয় এই মেগা প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মতুয়া তথা উদ্বাস্তু পরিবারগুলির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আশ্বাস ও নাগরিকত্বের গ্যারান্টি।
এদিন ঠাকুরনগরে জনসভার আগে প্রধানমন্ত্রী সোজা চলে যান ঠাকুরবাড়ির নাটমন্দিরে। সেখানে হরিচাঁদ ঠাকুর, গুরুচাঁদ ঠাকুর এবং বড়মার মূর্তিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানান তিনি। জনসভার শুরুতেই আবেগপ্রবণ প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করে বলেন, “ওড়াকান্দি যাওয়ার সেই স্মৃতি আজও সতেজ। বড়মার আশীর্বাদ ও মমতা আমি কোনোদিন ভুলব না।” মতুয়াদের সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্ক যে নিছক রাজনীতির নয়, বরং এক গভীর ‘আত্মীয়তার’, তা বারবার মনে করিয়ে দেন তিনি।
উদ্বাস্তু ভোটব্যাঙ্ককে লক্ষ্য করে এদিন অত্যন্ত কড়া ও স্পষ্ট বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “শরণার্থীদের জন্য প্রথম সরব হয়েছিল জনসংঘ। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সেই সংস্কারই আমরা বহন করছি।” সিএএ প্রসঙ্গ টেনে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা সিএএ আইন লাগু করেছি। আপনাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবেই। আপনারা স্থায়ী ঠিকানা পাবেন, প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি পাবেন। প্রত্যেক ভারতবাসী যে অধিকার পায়, আপনারাও তা পাবেন। এটা মোদীর গ্যারান্টি।”
তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ এনে তিনি বলেন, শরণার্থীদের সুখ-দুঃখের দায়িত্ব বিজেপির। বিরোধীদের ‘মিথ্যে প্রচার’ থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। ঠাকুরনগরের সভা থেকেই প্রধানমন্ত্রী তৃণমূলের পুরনো স্লোগান ‘মা-মাটি-মানুষ’ নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেন। তাঁর দাবি, ১৫ বছর আগে এই স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এলেও এখন তৃণমূল এই নাম উচ্চারণ করতে ভয় পায়।
মোদীর কথায়, “মা আজ কাঁদছে অত্যাচারে, মাটিকে তুলে দেওয়া হয়েছে অনুপ্রবেশকারী ও সিন্ডিকেটের হাতে, আর মানুষ রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।” সন্দেশখালি এবং আরজি করের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলার নারীরা আজ অসুরক্ষিত। অপরাধীদের আড়াল করার অভিযোগ তুলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ৪ মে-র পর বিজেপি সরকার গড়লে ‘জঙ্গলরাজ’ সৃষ্টিকারী গুন্ডা ও ধর্ষকদের কড়া হিসাব নেওয়া হবে।
বাংলার সাধারণ মানুষের জন্য একগুচ্ছ জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আবাস যোজনায় পাকা বাড়ি তৈরির জন্য দেড় লক্ষ টাকা। স্বাস্থ্য প্রকল্পে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং মহিলাদের জন্য সার্ভিক্যাল ক্যানসারের টিকা। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে স্নাতক পাসের জন্য ৫০ হাজার টাকা ও গর্ভবতী মহিলাদের জন্য ২১ হাজার টাকার আর্থিক সাহায্য। পাটের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দ্বিগুণ করা এবং বন্ধ পাটকলগুলির পুনরুজ্জীবন।
ঠাকুরনগরের পর হুগলীর হরিপালে সভা এবং দিনের শেষে প্রধানমন্ত্রীর গন্তব্য তিলোত্তমা কলকাতা। বিকেলে পাল অ্যাভিনিউ থেকে খান্না মোড় পর্যন্ত এক বর্ণাঢ্য রোড-শো করবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, প্রথম দফার ভোটে তৃণমূলের ‘অহঙ্কার’ ভেঙে গিয়েছে এবং দ্বিতীয় দফায় বিজেপির জয় নিশ্চিত। নেতাজির সেই বিখ্যাত স্লোগান স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “নেতাজি রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, আমি আপনাদের কাছে সোনার বাংলা গড়ার জন্য একটা ভোট চাইছি।”
রাজনৈতিক মহলের মতে, দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে মতুয়া ভোটব্যাঙ্ককে আশ্বস্ত করা এবং নারী নিরাপত্তাকে ইস্যু করে মোদী আজ যে প্রচার চালালেন, তা নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এখন দেখার, প্রধানমন্ত্রীর এই ‘গ্যারান্টি’ ব্যালট বক্সে কতটা প্রভাব ফেলে।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন