Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

পরমাণু শক্তিতে ভারতের বিশ্বজয়: থোরিয়াম প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে ঐতিহাসিক সাফল্য

 

Electricity-Generation-Using-Thorium-Technology

সমকালীন প্রতিবেদন : শক্তি উৎপাদনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল ভারত। প্রথাগত ইউরেনিয়ামের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তেজস্ক্রিয় থোরিয়াম ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে এক ঐতিহাসিক সাফল্য ধরা দিল নয়াদিল্লির হাতে। তামিলনাড়ুর কলপক্কমে অবস্থিত দেশের প্রথম ‘ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’ (পিএফবিআর) সম্প্রতি ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করেছে। বিজ্ঞানীদের এই সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একে অসামরিক পরমাণু কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের এক ‘যুগান্তকারী পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ভারতের পরমাণু বিজ্ঞানের জনক হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা একটি ত্রিমুখী পরিকল্পনার নীল নকশা তৈরি করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ভারতের বিশাল থোরিয়াম ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। ১৯৬৬ সালে তাঁর রহস্যজনক মৃত্যুর পর সেই পরিকল্পনা থমকে গেলেও, সাড়ে তিন দশক আগে পুনরায় সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করে কেন্দ্র। কলপক্কমের এই সাফল্য আসলে ভাবার সেই অপূর্ণ স্বপ্নকেই বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনল।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি এমন একটি চুল্লি যা ব্যবহারের তুলনায় বেশি জ্বালানি উৎপাদন করে। যদি কোনো গাড়ি ১০ লিটার জ্বালানি নিয়ে যাত্রা শুরু করে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ১২ লিটার জ্বালানি ফেরত দেয়, বিষয়টি ঠিক তেমনই। কলপক্কমের ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন এই চুল্লিটি ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম পুড়িয়ে বিদ্যুৎ তৈরির পাশাপাশি থোরিয়ামকে ইউরেনিয়াম-২৩৩ তে রূপান্তরিত করবে, যা পুনরায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এটি এমন একটি চক্র যা শক্তির জোগানকে কখনও ফুরিয়ে যেতে দেবে না।

থোরিয়াম প্রযুক্তিতে বিশ্বের তাবড় দেশগুলি যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে ভারতের এই সাফল্য ঈর্ষণীয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতীতে ১৫০০ কোটি ডলার ব্যয় করেও যা করতে পারেনি, ভারত মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকায় সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে। জাপান ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলিও এই প্রযুক্তি ব্যবহারে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে পিছু হটেছিল। বর্তমানে এই প্রযুক্তি একমাত্র রাশিয়ার হাতে রয়েছে। ভারত দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এই তালিকায় নাম তুলল। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট থোরিয়াম ভাণ্ডারের প্রায় ২৫ শতাংশই ভারতের হাতে রয়েছে।

পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রাক্তন প্রধান অনিল কাকোদর এই মুহূর্তটিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইউরেনিয়াম থেকে সাধারণের তুলনায় ৮০-১০০ গুণ বেশি শক্তি আহরণ সম্ভব। যদিও এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে আরও প্রায় ১০ বছর সময় লাগতে পারে। ২০২৭ সালের মধ্যে জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার পরিকাঠামো সম্পূর্ণ হয়ে গেলে ভারত তার শক্তির চাহিদায় সম্পূর্ণ আত্মনির্ভর হতে পারবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আগামী ৭০০ বছর ভারতকে বিদ্যুতের কাঁচামাল নিয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা করতে হবে না। কলপক্কমের এই সাফল্য ভারতকে বিশ্ব পরমাণু মানচিত্রে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিল, যা অদূর ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার চিত্র বদলে দেবে।‌




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন