Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

রবিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৩

অক্ষয় তৃতীয়ায় অক্ষয় যাপন

 

Akshay-Tritiya

অক্ষয় তৃতীয়ায় অক্ষয় যাপন

পীযূষ হালদার

বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া বা শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথি হল এক আশীর্বাদ। আহ্বিক আর বার্ষিকগতির অনেক তিথিই আশীর্বাদ বর্ষণ করে। মহাকালের উপত্যকায় সাজানো আছে পরম লগ্ন আর মুহূর্তের বন্ধনে কত না শুভদিন। সেই আশীর্বাদবর্ষী তিথি অক্ষয় তৃতীয়া। হিন্দু আর জৈন ধর্মের মানুষদের জন্য এর তাৎপর্য আলাদা। 

পুরানে উল্লেখ আছে, এই দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন নারায়ণের ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম। বেদব্যাস আর  সিদ্ধিদাতা গণেশ এই দিনেই শুরু করেছিলেন মহাভারত রচনা। রাজা ভগীরথ মা গঙ্গাকে মর্ত্যে এনেছিলেন এই দিনেই। মহাদেবের ইচ্ছায় কুবেরের লক্ষ্মীলাভকে স্মরণে রেখে এই দিনেই করা হয় বৈভব লক্ষ্মী পুজো। 

যার ক্ষয় নেই সেই অক্ষয়। অনন্তকাল রয়ে যাবার আশায় এই দিনেই যে কোনও শুভ কাজের সূচনা করা হয়। পুরীতে জগন্নাথ দেবের রথ তৈরির কাজ শুরু হয় এই দিনে। আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে ধরিত্রী পুজো হয় এই সময়। মা বসুন্ধরার এ হল নতুন করে সুজলা সুফলা হয়ে ওঠার সময়। পৃথিবীও তার নব পরিক্রমা শুরু করে এই মহেন্দ্রযোগে। ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সূচনার বা পরিবারের মঙ্গল কামনায় সোনার গয়না বা রত্নালঙ্কার কেনার এইতো দিন। 

বিষ্ণু পুরাণ থেকে নিয়ে মহাভারতে সর্বত্রই এই অক্ষয় মাহাত্ম্যের অমৃত কথার উল্লেখ আছে। সখা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সুদামা এসেছেন দারকায়। দীন ব্রাহ্মণ বাল্যবন্ধুর জন্য পুটুলিতে বেঁধে এনেছেন সামান্য খাবার। মধুসূদন সেটুকু আহার করে তৃপ্ত হয়েছেন। সুদামাকে দেখে তার অভাবক্লিষ্ট জীবনের কথা শ্রীকৃষ্ণ অন্তরদৃষ্টিতে দেখে নিয়েছেন। 

কিছু সময় অতিবাহিত করে সুদামা ফিরে এলেন বৃন্দাবনে। সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষায় আছে সবচেয়ে বড় বিস্ময়। কোথায় সেই ছায়া মাখা ছোট্ট কুটির! সেই স্থানে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ স্পর্ধি রাজপ্রাসাদ। আরও বিস্ময়, সেখানে পথ চেয়ে বসে আছে স্বর্ণালঙ্কার ভূষিতা স্ত্রী বসুন্ধরা ও সন্তানরা। পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী অক্ষয় তৃতীয়াতেই সুদামার দারিদ্র-ভঞ্জন করেন মাধব। 

দেবী অন্নপূর্ণা জীবকে অন্ন দান করে সকলের কাছে পূজিত হন, তাঁর জন্মও এই পূর্ণ তিথিতে। আবার বৈদিক মতে, এই দিনে যে কোনও শুভ কাজ বা অশুভ কাজের ফল হয় চিরন্তন। এই দিনটি সাক্ষী হয়ে আছে মহাভারতের এক অমোঘ সত্যের। যে কুকর্ম এখনও হিন্দু মানুষের মনকে টলিয়ে দেয়। 

মহাপাপি দু:শাসন, মন্ত্রী–শান্ত্রী ভরা রাজসভায় পাঞ্চালির বস্ত্রহরণের চেষ্টা করেছিলেন। এই দিনেই চক্রধারী জনার্দন তাঁর লজ্জা নিবারণ করেছিলেন। এ হল শরনাগতের জন্য পরিত্রাতার আবির্ভাবের দিন। কেদারবদ্রী মন্দিরের দ্বার ছয় মাস বন্ধ থাকে। তা এই অনন্ত জ্যোতিস্রোতের উৎস দিনেই খোলা হয়। আর প্রতিবারই দেখা যায়, মন্দিরের ভিতরে ছ'মাস আগে জ্বালানো অক্ষয় দীপকে জজ্বল্যমান অবস্থায়।     

মহারাজ যুধিষ্ঠিরের একবার এই তিথির মাহাত্ম্যের কথা জানার ইচ্ছা হল। মহামুনি শতানিক সেই আখ্যানে বললেন, 'প্রাচীনকালে এক নির্দয় ব্রাহ্মণের কাছে একজন ক্ষুধার্ত মানুষ অন্ন ভিক্ষা চাইলে অত্যন্ত দুর্বাক্য বলে বিতাড়িত করেন। ক্ষুধার্ত পিড়ীত মানুষটি চলে যাচ্ছেন দেখে ব্রাহ্মণের স্ত্রী এসে স্বামীকে বুঝিয়ে তাকে শীতল জল আর অন্নব্যঞ্জন পরিবেশন করলেন। ক্ষুধা নিবৃত্তি করে মানুষটি ব্রাহ্মণ পত্নিকে আশীর্বাদ করে সেই অন্ন জল দানকে অক্ষয় দানের স্বীকৃতি দিয়ে চলে গেলেন। 

বহুকাল পরে সেই গৃহী ব্রাহ্মণের মৃত্যু উপস্থিত হল। যমদূতরা তার উপর অত্যাচার শুরু করল। ব্রাহ্মণ তাদের কাছে দু'ফোঁটা জল চাইলেন। যমদূতেরা সেই পুরনো কৃতকর্মের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে টানতে টানতে মৃত্যুলোকের অধিপতী ধর্মরাজের কাছে নিয়ে গেল। ধর্মরাজ অকারণে ব্রাহ্মণকে অভিযুক্ত করে ক্লেশ দেওয়ার জন্য যমদূতদের ভৎসনা করলেন। তাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন, বৈশাখী শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে এর স্ত্রী যে দান করেছিল, তা অমরত্বের দাবি রাখে। অতএব এর নরকবাস হবে না। 

বাঙালির 'বাণিজ্যে বসতে লক্ষী'‌-র ভাবনা আর স্বর্ণ উৎসবের উজ্জল এই অক্ষয় যাপন। দেশ জুড়ে আনন্দে উৎসবে আর সমাদরে পালন করা হয় অক্ষয় তৃতীয়া। অকুণ্ঠ দান করা হয়। সোনার গয়না কেনার রেওয়াজ দেখা যায় বঙ্গবধূদের। অক্ষয় থাকুক অক্ষয় তৃতীয়া। 

* ঋণী --- উদ্বোধন পত্রিকা ও অন্যান্য সাময়িক পত্রিকা। 


          




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন